সর্বশেষ প্রকাশিত

বেতন নিয়ে অনিশ্চয়তা: মাদ্রাসা শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ও স্থায়ী সমাধানের দাবি

মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মাসের ১ তারিখেই বেতন ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হলেও তার সুফল পাচ্ছেন না দেশের হাজার হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষক। বেতন ছাড়ের প্রায় ৫ দিন পার হয়ে গেলেও এখনও এমপিও কপি (MPO Copy) সার্ভারে আপলোড না হওয়ায় বেতন বিল জমা দিতে পারছেন না প্রতিষ্ঠান প্রধানরা। ফলে মাসের প্রথম সপ্তাহেও বেতন পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা।

১. সার্ভার জটিলতা ও ডিজিটাল বিড়ম্বনা

তথ্যমতে, বেতন ছাড়ের পর সেই বেতন উত্তোলনের জন্য সংশ্লিষ্ট ‘এমপিও শীট’ বা কপি প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের সার্ভারে নভেম্বর ২০২৫-এর আপডেট কপি না থাকায় বেতন প্রক্রিয়া থমকে আছে। শিক্ষকরা বলছেন, “অধিদপ্তর বেতন ছাড়ে যতটা তৎপর, সার্ভারে তথ্য হালনাগাদে ততটাই উদাসীন।”

২. কমিটিহীন প্রতিষ্ঠানে স্বাক্ষর জটিলতা

চলমান বিশেষ পরিস্থিতিতে দেশের অধিকাংশ মাদ্রাসায় বর্তমানে নিয়মিত ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি নেই। অনেক ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা জেলা প্রশাসকদের ওপর। ফলে বেতন বিলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর নিতে গিয়ে নানা প্রশাসনিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়তে হচ্ছে শিক্ষকদের। এই সমন্বয়হীনতার কারণে বেতনের ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ঘুরতেই মাসের অর্ধেক সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।

৩. ১১ বছরের পুরোনো চিত্র: নেই নির্দিষ্ট তারিখ

একজন ভুক্তভোগী শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “চাকরির ১১ বছরেও আজ পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারলাম না যে মাসের ঠিক কত তারিখে বেতন পাব। প্রতি মাসেই বেতন ছাড় নিয়ে দফায় দফায় নিউজ হয়, সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা চলে। অথচ সরকারি অন্যান্য সেক্টরে মাসের শুরুতেই বেতন নিশ্চিত থাকে।”

৪. ৮০% শিক্ষকের আর্থিক অস্বচ্ছলতা ও ‘বেসিক’ বৈষম্য

পরিসংখ্যান বলছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রায় ৮০ শতাংশই আর্থিক অস্বচ্ছলতার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করেন। অধিকাংশ শিক্ষকের কাছে এই বেতনটুকুই একমাত্র সম্বল। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে মাসের ১০-১৫ তারিখ পর্যন্ত বেতনের জন্য অপেক্ষা করা তাদের জন্য অমানবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৫. স্থায়ী সমাধানের দাবি: শিক্ষকদের ৫ দফা প্রত্যাশা

শিক্ষক সমাজ এই “বেতন-নাটক” বন্ধে এবং স্থায়ী সমাধানের লক্ষে নিচের দাবিগুলো উত্থাপন করেছেন:

  • প্রতি মাসের ১ থেকে ৫ তারিখের মধ্যে বেতন প্রদান নিশ্চিত করা।

  • বেতন ছাড়ের সঙ্গে সঙ্গেই এমপিও কপি সার্ভারে অটো-আপলোড নিশ্চিত করা।

  • কমিটি বিহীন প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় দ্রুত বেতন ছাড়ের আইনি নির্দেশনা।

  • বেতন নিয়ে প্রতি মাসের অনিশ্চয়তা ও তথাকথিত ‘নিউজ নাটক’ বন্ধ করা।

  • দীর্ঘমেয়াদে সরকারি ট্রেজারির মাধ্যমে সরাসরি শিক্ষকদের অ্যাকাউন্টে বেতন প্রদান।

শিক্ষকদের মতে, মানুষ গড়ার কারিগরদের যদি প্রতি মাসে বেতনের জন্য লড়াই করতে হয়, তবে শিক্ষার মান উন্নয়ন অসম্ভব। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের উচিত ডিজিটাল সিস্টেমকে আরও কার্যকর করে শিক্ষকদের এই মানসিক ও আর্থিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *