বিশেষ প্রতিবেদন: ১১–২০ গ্রেডের দাবি বনাম পে-স্কেল রাজনীতি; সাধারণ কর্মচারীরা কি দাবার ঘুঁটি?
সরকারি চাকরিতে বেতন বৈষম্য নিরসনের দাবিতে আন্দোলন এখন তুঙ্গে। তবে এই আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি এবং দাবিদাওয়ার ধরণ নিয়ে খোদ সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যেই তীব্র ক্ষোভ ও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, আন্দোলন কি সত্যিই ১১–২০ গ্রেডের অবহেলিত কর্মচারীদের জন্য, নাকি এর আড়ালে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আরও সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার ছক কষা হচ্ছে?
বৈষম্য নিরসন নাকি নতুন বৈষম্যের ফাঁদ?
আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কথা ছিল ১১–২০ গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং তাদের বেতন কাঠামোর আমূল পরিবর্তন। কিন্তু দাবিনামায় যখন ‘পুরো পে-স্কেল পরিবর্তন’ বা ‘নতুন পে-কমিশন’ গঠনের কথা বলা হয়, তখন হিসাব পাল্টে যায়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়:
উচ্চস্তরের স্থিতিশীলতা: ১–১০ গ্রেডে যারা আছেন, তাদের সুযোগ-সুবিধা, সামাজিক সুরক্ষা এবং বেতন কাঠামো ইতিমধ্যেই বেশ মজবুত।
আনুপাতিক হারের মারপ্যাঁচ: যখন ঢালাওভাবে পে-স্কেল বাড়ানো হয়, তখন শতকরা হিসেবে উচ্চপদস্থদের বেতন যে পরিমাণ বাড়ে, তার তুলনায় ১১–২০ গ্রেডের কর্মচারীদের প্রাপ্তি থাকে সামান্য।
অধিকারের অপব্যবহার: নিচতলার কর্মচারীদের সংখ্যাধিক্যকে ব্যবহার করে আন্দোলন জমানো হয়, অথচ সুবিধা বণ্টনের সময় ওপরের স্তরই সিংহভাগ কেড়ে নেয়।
দালালি ও নেতৃত্বের সংকট
সাধারণ কর্মচারীদের বড় একটি অংশের অভিযোগ, আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা তথাকথিত নেতাদের একটি অংশ আসলে ‘কর্মকর্তাদের দালাল’ হিসেবে কাজ করছে। তারা সাধারণ কর্মচারীদের আবেগকে উসকে দিয়ে মিছিল-মিটিংয়ে নামালেও টেবিল টক বা আলোচনার সময় উচ্চপদস্থদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত থাকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী বলেন, “আমরা রোদে পুড়ি, বৃষ্টিতে ভিজি বেতনের দাবিতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের নাম ব্যবহার করে কর্মকর্তারা তাদের গাড়ির তেল খরচ আর বিলাসিতার টাকা বাড়িয়ে নেন। এটি স্রেফ প্রহসন।”
দাবি হওয়া চাই স্পষ্ট ও লক্ষ্যভিত্তিক
সচেতন কর্মচারীদের মতে, সত্যিকারের ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হলে আন্দোলনকে হতে হবে নির্দিষ্ট এবং সীমাবদ্ধ। তাদের দাবিগুলো হওয়া উচিত:
শুধুমাত্র ১১–২০ গ্রেডের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো বা বিশেষ স্কেল নির্ধারণ।
গ্রেডগুলোর মধ্যবর্তী ব্যবধান কমানো।
উচ্চস্তরের সুবিধা বাড়ানোর দাবি থেকে সরে এসে নিম্নস্তরের কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা নিশ্চিত করা।
সচেতন হওয়ার আহ্বান
পুরো কাঠামো পরিবর্তনের নামে যারা স্বার্থান্বেষী মহলের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়, তাদের প্রত্যাখ্যান করার সময় এসেছে। সাধারণ কর্মচারীদের বুঝতে হবে, তাদের লড়াইটা যেন শুধু তাদেরই অধিকার আদায়ের হয়, অন্য কারো আখের গোছানোর হাতিয়ার হিসেবে নয়।
উপসংহার: বৈষম্য দূর করার লড়াই তখনই সার্থক হবে যখন দাবিগুলো হবে স্বচ্ছ এবং লক্ষ্যভিত্তিক। ১১–২০ গ্রেডের কর্মচারীদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। এই অবস্থায় ‘পুরো পে-স্কেল’ পরিবর্তনের ধোঁয়াশা ত্যাগ করে শুধুমাত্র বঞ্চিতদের জন্য সুনির্দিষ্ট সংস্কারই হতে পারে প্রকৃত সমাধান।

