প্রস্তাবিত বেতন স্কেল ২০২৫: মধ্যম গ্রেডে রয়ে গেল চরম বৈষম্য, ক্ষুব্ধ সরকারি কর্মচারীরা
বৈষম্যবিরোধী সরকারের আমল পরিবর্তনের হাওয়ায় সংস্কারের বড় প্রত্যাশা থাকলেও, প্রস্তাবিত ‘জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৫’ নিয়ে জনমনে নতুন করে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি সংস্কার কমিশনের জমা দেওয়া একটি বেতন কাঠামোর তালিকা (প্রস্তাবিত) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেখা যায়, ওপরের স্তরের গ্রেড এবং নিচের স্তরের গ্রেডের তুলনায় মাঝখানের গ্রেডগুলোতে বেতন বৃদ্ধির হার ও ব্যবধান সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে ‘বৈষম্যমুক্ত’ বেতন কাঠামোর যে দাবি দীর্ঘদিনের ছিল, তা অপূর্ণই রয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গ্রেডভিত্তিক ব্যবধানে অসঙ্গতি
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গ্রেড-০১ এর বেতন ১,৬০,০০০ টাকা (নির্ধারিত) প্রস্তাব করা হলেও, গ্রেড-০৯ থেকে গ্রেড-১৩ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির হারের মধ্যে ব্যাপক অসামঞ্জস্য রয়েছে।
বিশাল ব্যবধান: গ্রেড-১০ (৩২,০০০ – ৭৭,৩০০) থেকে গ্রেড-০৯ (৪৫,১০০ – ১,০৮,৮০০) এর মধ্যে প্রারম্ভিক বেতনের পার্থক্য প্রায় ১৩,১০০ টাকা। অথচ নিচের দিকের গ্রেডগুলোতে এই ব্যবধান মাত্র কয়েকশ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
মাঝারি গ্রেডের উপেক্ষা: গ্রেড-১১ থেকে গ্রেড-১৭ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির পরিসর অত্যন্ত সংকীর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, গ্রেড-১৪ এবং গ্রেড-১৫ এর মধ্যে প্রারম্ভিক পার্থক্য মাত্র ৭০০ টাকা।
বৈষম্যবিরোধী সরকারের আমলেও কেন বৈষম্য?
আন্দোলন-পরবর্তী সংস্কারের এই সময়ে সাধারণ কর্মচারীদের প্রত্যাশা ছিল গ্রেডের সংখ্যা ২০টি থেকে কমিয়ে ১০-১২টিতে নামিয়ে আনা হবে। কিন্তু প্রস্তাবিত তালিকায় ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। কর্মচারীদের দাবি, গ্রেড-০১ এবং গ্রেড-২০ এর বেতনের অনুপাত ১:৮ বা তার কম হওয়া উচিত ছিল, যা বর্তমানে প্রায় ১:১০ এর কাছাকাছি রয়ে গেছে।
“আমরা ভেবেছিলাম এবার অন্তত মাঝখানের গ্রেডগুলোর বেতন সম্মানজনক পর্যায়ে আসবে এবং গ্রেড বৈষম্য দূর হবে। কিন্তু প্রস্তাবিত তালিকায় দেখা যাচ্ছে, উচ্চপদস্থদের সুবিধা বজায় রেখে মধ্যম ও নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের সেই আগের মতোই প্রান্তিক পর্যায়ে রাখা হয়েছে।” — নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সচিবালয় কর্মচারী।
মূল আপত্তির জায়গাগুলো:
১. গ্রেড সংখ্যা: ২০টি গ্রেড বজায় রাখায় পদোন্নতি পেলেও আর্থিক সচ্ছলতা খুব একটা বাড়ে না। ২. বাজারমূল্যের সাথে অসংগতি: বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে নিচের দিকের গ্রেডগুলোর বেতন (২০,০০০ – ২৫,০০০) দিয়ে একটি পরিবারের জীবনযাত্রার মান বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব। ৩. ধাপ বিন্যাস: ওপরের ৫টি গ্রেড যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে, মাঝখানের ১০টি গ্রেডে সেই ধারাবাহিকতা অনুপস্থিত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করার আগে সংস্কার কমিশনকে অবশ্যই মাঝখানের গ্রেডগুলোর ব্যবধান কমিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। অন্যথায় সরকারি সেবা খাতের বড় একটি অংশ অসন্তুষ্ট থেকে যাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনিক গতিশীলতায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে।


