‘পে-স্কেল বিলাসিতা নয়, বাঁচার দাবি’: দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে পিষ্ট মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত
“পে-স্কেল কোনো বিলাসিতা না, এটা ন্যায্য বেঁচে থাকার দাবি। খালি পেট নিয়ে লজ্জা হয় না, লজ্জা হয় যখন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের সঠিক মূল্য মেলে না।”— সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজন সরকারি কর্মচারীর এই আর্তনাদ এখন কোটি শ্রমজীবী মানুষের মনের কথা। ক্রমাগত বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি এবং স্থবির হয়ে পড়া বেতন কাঠামো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বাজারের আগুন ও বেতনের বাস্তবতা
গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ৩০% থেকে ৫০%। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। তথ্যাদি বিশ্লেষণে দেখা যায়:
ভোক্তা মূল্যসূচক (CPI): বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি বর্তমানে দুই অঙ্কের ঘরে স্পর্শ করছে।
আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য: যাদের বেতন ৫-৬ বছর আগে যা ছিল, বর্তমানেও প্রায় কাছাকাছি পর্যায়ে আছে, তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে প্রায় ৪০%।
পুষ্টি ঘাটতি: খরচ সামলাতে গিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো মাছ-মাংসের মতো প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার তালিকা থেকে বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে।
কেন নতুন পে-স্কেল এখন সময়ের দাবি?
অর্থনীতিবিদদের মতে, বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল সাধারণত প্রতি ৫ বছর অন্তর পুনর্বিন্যাস করা উচিত। কিন্তু দীর্ঘ বিরতির ফলে বর্তমান বেতন কাঠামো বাজারের বাস্তবতার সাথে পুরোপুরি সংগতি হারিয়েছে।
“একজন শ্রমিক বা কর্মচারী যখন তার পুরো মাস পরিশ্রমের বিনিময়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে পরিবারের এক সপ্তাহের বাজারও ঠিকমতো করতে পারেন না, তখন সেই কর্মস্পৃহা নষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। এটি কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং জাতীয় উৎপাদনশীলতার জন্যও হুমকি।”
বিশ্লেষণে প্রাপ্ত মূল সংকটসমূহ:
১. আবাসন ও পরিবহন ব্যয়: বড় শহরগুলোতে আয়ের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে বাড়ি ভাড়ায়। বর্তমান বেতন কাঠামোতে আবাসন ভাতা যা দেওয়া হয়, তা প্রকৃত ভাড়ার তুলনায় নগন্য।
২. শিক্ষা ও চিকিৎসা: সন্তানদের পড়াশোনা এবং পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেকেই ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন।
৩. মানসিক চাপ ও দুর্নীতি: আর্থিক অসচ্ছলতা কর্মচারীদের মধ্যে মানসিক অবসাদ তৈরি করছে, যা পরোক্ষভাবে দুর্নীতির পথকে প্রশস্ত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
উপসংহার
বেঁচে থাকার ন্যূনতম চাহিদাকে ‘বিলাসিতা’ হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে এবং মেহনতি মানুষের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে একটি যুগোপযোগী ও সম্মানজনক পে-স্কেল এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। মানুষ ভিক্ষা চায় না, চায় তাদের ঘামের ন্যায্য পাওনা।

