নতুন পে-স্কেল: ডিসেম্বরের শেষে চূড়ান্ত সুপারিশ, ফেসবুকে ছড়ানো নথি ‘ভুয়া’
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল প্রণয়নে গঠিত পে কমিশন চলতি ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ জমা দিতে পারে। কমিশন ইতোমধ্যে সুপারিশ তৈরির প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ শেষ করেছে এবং আগামী সপ্তাহে সচিবদের মতামত গ্রহণের পর রিপোর্ট চূড়ান্তকরণের দিকে এগোবে।
কমিশনের অগ্রগতি ও সময়সীমা
কমিশনের সদস্য ড. মোহাম্মদ আলী খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে নিশ্চিত করেছেন যে, তাঁরা দ্রুততার সঙ্গে রিপোর্ট চূড়ান্ত করার কাজ করছেন এবং ডিসেম্বরের শেষ দিকে এটি জমা দিতে পারবেন বলে আশাবাদী। তিনি আরও জানান, গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডারদের মতামত নেওয়ার অংশ হিসেবে আগামী সোমবার কমিশনের সঙ্গে সচিবদের সভা রয়েছে।
সরকার গত জুলাইয়ের শেষ দিকে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানকে সভাপতি করে ২৩ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ গঠন করে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কমিশনের প্রথম সভার তারিখ থেকে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেওয়ার কথা। দীর্ঘ বিরতির পর সরকারি কর্মজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো তৈরির উদ্দেশ্যে এই কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার।
‘ভুয়া সুপারিশপত্র’ নিয়ে কমিশন সতর্ক
নতুন পে-স্কেল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি ১৫ পৃষ্ঠার একটি ‘সুপারিশপত্র’ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ছড়িয়ে পড়া নথিতে চাকরিজীবীদের গ্রেড ২০টিই রাখার কথা বলা হয়েছে এবং বিভিন্ন গ্রেডের বেতন বৃদ্ধি, ইনক্রিমেন্ট কাঠামো ও ভাতা সংশোধনের তথ্য দেওয়া হয়েছে।
তবে, পে কমিশন এই নথিটিকে সম্পূর্ণ ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর বলে জানিয়েছে।
ড. মোহাম্মদ আলী খান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যে ১৫ পৃষ্ঠার সুপারিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরছে, সেটি কমিশনের তৈরি নয় এবং এমন কোনো নথি তাঁদের কাছে নেই।
কমিশন আরও জানিয়েছে যে, বেতনস্কেলের খসড়া সুপারিশ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কোথাও কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি, আবার কোনো নথি প্রকাশ বা ফাঁসও করা হয়নি।
ফেসবুকে প্রচারিত নথিতে কমিশনের নাম-লোগো ব্যবহার করে বিভিন্ন গ্রেডে বেতন বাড়ানোর বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, যা সাধারণ সরকারি চাকরিজীবীদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে ছড়ানো হয়েছে।
বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতা ও কর্মচারীদের অসন্তোষ
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার এলে এটি বাস্তবায়ন করবে।
উপদেষ্টার এই মন্তব্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভালোভাবে নেননি। তাঁরা চান, বর্তমান সরকারই এটি বাস্তবায়ন করুক। সরকারি কর্মচারীরা আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে পদক্ষেপ না নিলে আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন।
যদিও অন্তর্বর্তী সরকারই উদ্যোগ নিয়ে পে কমিশন গঠন করায় তাঁদের সদিচ্ছার ঘাটতি নেই বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, তবে সরকারি কর্মচারীদের দাবি দ্রুত বাস্তবায়নের।
জাতীয় বেতন স্কেল কি চলতি সরকার দিয়ে যাবে?
জাতীয় বেতন স্কেল চলতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাস্তবায়ন করবে কি না, তা নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি। বিভিন্ন সময়ে অর্থ উপদেষ্টার মন্তব্যে কিছুটা দ্বিধা ও অসঙ্গতি দেখা গেছে, যা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী পরিস্থিতিটি নিম্নরূপ:
১. অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্য: দ্বিধা ও অনিশ্চয়তা
প্রাথমিক ইঙ্গিত (আশার আলো): প্রথম দিকে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন যে, নতুন বেতন কাঠামো অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেই গেজেটের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সরকার পর্যন্ত অপেক্ষা করা হবে না।
পরবর্তী ইঙ্গিত (অনিশ্চয়তা): পরে তিনি আবার ইঙ্গিত দেন যে, বর্তমান সরকার কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করবে, আর পরবর্তী নির্বাচিত সরকার সেটি বাস্তবায়ন করবে। তিনি কারণ হিসেবে বাজেটের সীমাবদ্ধতা এবং অন্যান্য সামাজিক খাতকে বিবেচনায় রাখার কথা উল্লেখ করেন।
সর্বশেষ অবস্থান: এই মুহূর্তে সরকারী পক্ষ থেকে বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সময়সীমা বা সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা হয়নি।
২. পে কমিশনের অগ্রগতি
পে কমিশন ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের মধ্যে তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে।
প্রতিবেদন তৈরি সম্পন্ন হওয়ার পরই সরকার বাস্তবায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
৩. সরকারি কর্মচারীদের অবস্থান
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চান, বর্তমান সরকারই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করুক, কারণ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিষয়টি ঝুলে যেতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
তাঁরা ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে পদক্ষেপ না নিলে কঠোর আন্দোলন ও কর্মসূচিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন।
সংক্ষেপে, বর্তমানে সরকারি কর্মচারীরা জোরালো দাবি জানালেও এবং কমিশন ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দিলেও, অর্থ উপদেষ্টার বিভিন্ন মন্তব্যের কারণে এই সরকার এটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করবে কিনা, সেই বিষয়ে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা নেই।

