সরকারি চাকুরেদের বেতন বৃদ্ধি: বাস্তবতা বনাম অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
সম্প্রতি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর যে সুপারিশ করা হয়েছে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানামুখী আলোচনা। একদিকে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ কর্মচারীদের নাভিশ্বাস দশা, অন্যদিকে দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত ব্যয় নির্বাহ করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, সরকারের বর্তমান রাজস্ব আয় বিবেচনায় নিলে একসঙ্গে সব স্তরে বেতন বাড়ানো ‘অযৌক্তিক’।
সুপারিশ বনাম বর্তমান পরিস্থিতি
পে-কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডে বেতন ১৪২.৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডে ১০৫.৯৩ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
সর্বনিম্ন স্কেল: ৮,২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০,০০০ টাকা।
সর্বোচ্চ স্কেল: ৭৮,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
অর্থনীতির কঠিন সমীকরণ
জাহিদ হোসেন তার অভিমতে উল্লেখ করেছেন যে, এই বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ‘পরিচালন ব্যয়’ বহন করতে হবে। এটি কোনো এককালীন খরচ নয়। তিনি বলেন, বর্তমানে এনবিআর-এর পক্ষে ৪ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করাই যেখানে কঠিন হয়ে পড়ছে, সেখানে শুধুমাত্র প্রথম ধাপেই অতিরিক্ত ৩০ হাজার কোটি টাকা জোগাড় করা সরকারের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে।
মুদ্রাস্ফীতি ও জনজীবন
আপনার পর্যবেক্ষণের মতো অনেক সাধারণ চাকুরেরই দাবি—যদি প্রতি বছর মুদ্রাস্ফীতির সাথে সমন্বয় করে সামান্য হারে বেতন বাড়ানো হতো, তবে ১০ বছর পর পর এমন আকাশচুম্বী বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব করতে হতো না। মুদ্রাস্ফীতি যখন আকাশছোঁয়া, তখন বেতন না বাড়লে জীবনযাত্রার মান বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সমাধানের পথ কী?
অর্থনীতিবিদের মতে, ঢালাওভাবে সব স্তরে বেতন না বাড়িয়ে নিচের দিকের গ্রেডগুলোতে (যাদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে) বেতন বাড়ানোর যৌক্তিকতা রয়েছে। তিনি মনে করেন:
রাজস্ব আয় বৃদ্ধি: আগে আয়ের উৎস নিশ্চিত করতে হবে।
ভর্তুকি সমন্বয়: উন্নয়ন ব্যয় বা ভর্তুকি না কমিয়ে এই ব্যয় মেটানো কঠিন হবে।
ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন: একসঙ্গে সব গ্রেডে বড় অংকের বেতন না বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে চিন্তা করা যেতে পারে।
উপসংহার: যদিও পে-কমিশন সব তথ্য বিশ্লেষণ করেই প্রস্তাব দেয় এবং অতীতে দেখা গেছে এই প্রস্তাবগুলো শেষ পর্যন্ত কিছুটা কাটছাঁট করেই পাস হয়, তবুও এবারের চ্যালেঞ্জটা ভিন্ন। একদিকে সাধারণ কর্মচারীদের বাঁচার দাবি, অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা—সরকারকে এখন এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়েই একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে।

