📰 ১০ বছর ধরে অধরা নবম পে-স্কেল: কেন হচ্ছে না নতুন বেতন কাঠামো?
দীর্ঘ এক দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন স্কেল (নবম পে-স্কেল) এখনো অধরা। সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার প্রথা থাকলেও, সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম পে-স্কেল ঘোষণার পর থেকে আজ ২০২৫ সাল পর্যন্ত আর কোনো নতুন স্কেল আসেনি। এতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বাজারে জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা। প্রশ্ন উঠেছে— কেন এই দীর্ঘ বিরতি?
⏳ ঐতিহ্যবাহী ৫-৬ বছরের চক্র ভেঙে ১০ বছর: পে-স্কেলের ইতিহাস
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণার পর থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রতিটি বেতন কাঠামো গড়ে ৫ থেকে ৬ বছর পর পর সংশোধন করা হয়েছিল।
| পে-স্কেল ঘোষণা বছর | পে-স্কেলের সংখ্যা |
| ১৯৭৩ | ১ম |
| ১৯৭৭ | ২য় |
| ১৯৮৫ | ৩য় |
| ১৯৯১ | ৪র্থ |
| ১৯৯৭ | ৫ম |
| ২০০৫ | ৬ষ্ঠ |
| ২০০৯ | ৭ম |
| ২০১৫ | ৮ম (সর্বশেষ) |
২০১৫ সালের পর থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দশ বছর অতিক্রান্ত হলেও নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা না হওয়ায় এই দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে।
🤔 কেন হচ্ছে না নতুন পে-স্কেল? মূল কারণ বিশ্লেষণ
দশ বছর ধরে পে-স্কেল ঘোষণার এই দীর্ঘ বিলম্বের পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ উঠে আসছে:
১. অর্থনৈতিক চাপ ও রাজস্ব ঘাটতি:
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, সবচেয়ে বড় কারণ হলো সরকারের রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক চাপ।
কর-জিডিপির অনুপাত কম: দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)-এর তুলনায় কর আদায়ের হার বেশ কম। গত ১৭ বছরে জিডিপির আকার বাড়লেও রাজস্ব আহরণ সেভাবে বাড়েনি।
রাজস্ব কমে যাওয়া: সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রম কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়া এবং প্রবৃদ্ধির হার কমে যাওয়ায় রাজস্ব আহরণ কমে গেছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে সরকারি কোষাগারে বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ পড়বে।
ব্যয়ের খাত: সরকারি বেতন, ভাতা, পেনশন, সুদ পরিশোধ এবং ভর্তুকিতেই সরকারের আয়ের বড় অংশ খরচ হয়ে যায়। তাই নতুন করে বেতন বাড়লে সরকারের ব্যয় মেটানো কঠিন হবে।
২. অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সিদ্ধান্ত:
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষ দিকে অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানকে সভাপতি করে ২৩ সদস্যের ‘জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫’ গঠন করে। কমিশনকে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।
দ্বিধা-দ্বন্দ্ব: পে-কমিশন গঠিত হলেও সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টা জানান, নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার বিষয়ে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এসে সিদ্ধান্ত নেবে। যদিও তারা একটি ‘ফ্রেমওয়ার্ক’ রেখে যাবেন।
কর্মচারী অসন্তোষ: অন্তর্বর্তী সরকারের এই সিদ্ধান্তে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবি, যেহেতু অন্তর্বর্তী সরকারই কমিশন গঠন করেছে, তাই এই সরকারের আমলেই গেজেট প্রকাশ করতে হবে।
৩. মূল্যস্ফীতি ও বেতন-বৈষম্য:
২০১৫ সালের পর থেকে মূল্যস্ফীতির হার লাগামহীনভাবে বেড়েছে, যার ফলে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে। যদিও সরকারি কর্মচারীরা প্রতি বছর ৫% হারে ইনক্রিমেন্ট পাচ্ছেন, তবে দীর্ঘ ১০ বছর একই বেতন স্কেলে থাকায় জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে বেতনের সামঞ্জস্য কমে এসেছে। এই বৈষম্য দূর করে একটি নতুন কাঠামো প্রণয়নেও জটিলতা তৈরি হয়েছে।
📢 কর্মচারীদের আল্টিমেটাম: আন্দোলনের শঙ্কা
দীর্ঘসূত্রিতা ও অর্থ উপদেষ্টার মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলো এখন চরম অসন্তোষ প্রকাশ করছে। তারা ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশের আল্টিমেটাম দিয়েছেন। দাবি মানা না হলে জানুয়ারি থেকে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, যা প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
📝 পে-কমিশনের অগ্রগতি:
নবম পে-স্কেল প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিশন ইতোমধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছ থেকে মতামত নিয়েছে এবং সচিবদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। তারা বিদ্যমান ২০টি গ্রেড কমিয়ে বেতন-বৈষম্য দূর করার বিষয়েও কাজ করছে বলে জানা গেছে। কমিশন ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ জমা দিতে পারে।
এই মুহূর্তে, নবম পে-স্কেল ঘোষণার বিষয়টি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর নির্ভর করছে। কর্মচারীদের দাবি ও দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রেখেই সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এ সরকার কি নবম পে স্কেল দিবে না?
এই মুহূর্তে সরকারিভাবে নবম পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধা প্রকাশ করেছে।
নবম পে-স্কেল সম্পর্কিত বর্তমান পরিস্থিতি এবং সরকারের অবস্থান নিম্নরূপ:
১. পে-কমিশন গঠন (জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫)
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত জুলাই মাসে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের একটি ‘জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫’ গঠন করেছে। এই কমিশনকে ছয় মাসের মধ্যে, অর্থাৎ ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের মধ্যে, সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
২. সরকারের নীতিগত অবস্থান
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে অর্থ উপদেষ্টা জানিয়েছেন যে কমিশন প্রতিবেদন জমা দিলেও, নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্তভাবে ঘোষণা ও বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেবে দেশের পরবর্তী নির্বাচিত সরকার। সরকারের এই অবস্থান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
৩. কর্মচারীদের দাবি
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠনগুলো সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ডিসেম্বরের মধ্যে নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের জন্য আল্টিমেটাম দিয়েছে।
৪. কমিশনের সুপারিশ (প্রত্যাশিত)
কমিশন তাদের সুপারিশে বেতন গ্রেডের সংখ্যা ২০ থেকে কমিয়ে আনা এবং মহার্ঘ ভাতা (মূল বেতনের একটি অংশ) প্রদান করে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের প্রস্তাব করতে পারে।
সারসংক্ষেপ: কমিশন প্রতিবেদন জমা দিলেও, অন্তর্বর্তী সরকার নিজেই ঘোষণা না করে পরবর্তী সরকারের জন্য একটি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করে যেতে পারে। নবম পে-স্কেল ঘোষণা ও বাস্তবায়ন নির্ভর করছে কমিশনের চূড়ান্ত সুপারিশ এবং পরবর্তী সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।

