১ জুলাই থেকে নতুন বেতনকাঠামো: কাল প্রতিবেদন জমা দিচ্ছে কমিশন
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন ও ভাতা নির্ধারণের লক্ষ্যে গঠিত বেতন কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে যাচ্ছে। আগামীকাল বুধবার বিকেল ৫টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে এই প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করা হবে।
কমিশনের প্রধান ও সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খান কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে এই প্রতিবেদন জমা দেবেন। এ সময় উপস্থিত থাকবেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। আজ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থ উপদেষ্টা নিজেই এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বাস্তবায়নের সময়সীমা
সূত্রমতে, নতুন এই বেতনকাঠামো আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করার সুপারিশ করেছে কমিশন। তবে তার আগে ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে আংশিক বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের একটি প্রস্তাবনাও প্রতিবেদনে থাকছে। মূলত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকেই সরকারি কর্মচারীরা এর পূর্ণ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।
বেতন বৃদ্ধির সম্ভাব্য হার
নতুন বেতনকাঠামোতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন উভয় ক্ষেত্রেই বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে:
সর্বনিম্ন বেতন: বর্তমানে সরকারি চাকরিতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা। এটি দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
সর্বোচ্চ বেতন: বর্তমানে নির্ধারিত সর্বোচ্চ বেতন ৭৮,০০০ টাকা। এটি বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার বেশি করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বেতনের অনুপাত: সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের বৈষম্য কমাতে অনুপাত ১:৮ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশেষ নজর: এবার প্রস্তাবিত বেতনকাঠামোয় নিচের দিকের ধাপগুলোতে (গ্রেডগুলোতে) তুলনামূলক বেশি বেতন-ভাতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আর্থিক প্রভাব ও বাজেট প্রস্তুতি
বর্তমানে দেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নতুন বেতনকাঠামো পূর্ণ মাত্রায় বাস্তবায়ন করতে সরকারের বাড়তি ৭০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
ইতোমধ্যেই সরকার এই ব্যয় মেটানোর প্রস্তুতি শুরু করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে পরিচালন ব্যয় ২২ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে, যা মূলত নতুন বেতনকাঠামো আংশিক কার্যকরের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পটভূমি: ২০১৫ সালে সর্বশেষ বেতনকাঠামো ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় পর গত বছরের ২৭ জুলাই জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২১ সদস্যের এই বেতন কমিশন গঠন করা হয়। দীর্ঘ পর্যালোচনার পর আগামীকাল তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ পেশ করা হচ্ছে।
বাড়ি ভাড়া ও ভাতাদি মিলিয়ে সর্বনিম্ন বেতন কত হবে?
সরকারি কর্মচারীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন এবং তার সাথে বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে মাসিক মোট কত টাকা হতে পারে, তার একটি সম্ভাব্য হিসাব নিচে দেওয়া হলো:
সর্বনিম্ন সম্ভাব্য বেতনের হিসাব (২০তম গ্রেড)
কমিশন বর্তমানে সর্বনিম্ন মূল বেতন (Basic Pay) ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮,০০০ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকা করার প্রস্তাব করেছে। এই মূল বেতনের ওপর ভিত্তি করে বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য ভাতা যোগ করলে ঢাকার একজন সর্বনিম্ন গ্রেডের কর্মীর মোট বেতন (Gross Salary) দাঁড়াতে পারে নিম্নরূপ:
| খাতের নাম | বর্তমান (২০১৫ স্কেল) | প্রস্তাবিত (২০২৬ স্কেল) |
| মূল বেতন (Basic) | ৮,২৫০ টাকা | ১৮,০০০ – ২০,০০০ টাকা |
| বাড়ি ভাড়া (ঢাকা – ৫০%) | ৪,১ ২৫ টাকা | ৯,০০০ – ১০,০০০ টাকা |
| চিকিৎসা ভাতা | ১,৫০০ টাকা | ২,৫০০ – ৩,০০০ টাকা (সম্ভাব্য) |
| যাতায়াত ও অন্যান্য | ৫০০+ টাকা | ১,০০০ – ২,০০০ টাকা (সম্ভাব্য) |
| সর্বমোট মাসিক বেতন | ১৪,০০০+ টাকা | ৩০,৫০০ – ৪২,০০০ টাকা |
গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য:
বাড়ি ভাড়ার হার: সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কর্মস্থলের ওপর ভিত্তি করে বাড়ি ভাড়া মূল বেতনের ৩৫% থেকে ৫০% পর্যন্ত হয়ে থাকে। ঢাকার বাইরে যারা কাজ করেন, তাদের বাড়ি ভাড়া কিছুটা কম হওয়ায় মোট বেতন ৩৫,০০০ টাকার আশেপাশে হতে পারে।
ঢাকার বাইরে বেতন: ঢাকার বাইরে বিভাগীয় বা জেলা শহরে বাড়ি ভাড়ার হার কম হওয়ায় সেখানকার সর্বনিম্ন বেতন ৩০,০০০ থেকে ৩২,০০০ টাকার মধ্যে থাকতে পারে।
শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রস্তাব: বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া ভাতা পর্যায়ক্রমে ১৫% পর্যন্ত বাড়ানোর একটি আলাদা প্রস্তাব ইতোমধ্যে বিবেচনাধীন রয়েছে, যা ২০২৬ সালের জুলাই থেকে পূর্ণাঙ্গ কার্যকর হতে পারে।
উল্লেখ্য: এটি কমিশনের প্রাথমিক সুপারিশ ও তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তৈরি একটি সম্ভাব্য হিসাব। আগামীকাল বুধবার বিকেল ৫টায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সরকার কর্তৃক চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের মাধ্যমেই সঠিক অংকটি জানা যাবে।

