‘পেটের ক্ষুধার দায়ে আন্দোলনে নেমেছি, আমাদের আর খাঁচায় বন্দি রাখবেন না’
বাংলাদেশ তৃতীয় শ্রেণী সরকারি কর্মচারী সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির আহবায়ক কমিটির সদস্য কবির মনির হোসেন বলেছেন, সাধারণ কর্মচারীরা আজ দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা সাধারণ কর্মচারীরা দু-মুঠো ভাত খেয়ে বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ের আন্দোলন করছি। পেটের ক্ষুধা নিবারণের জন্য আমাদের এই লড়াই। দয়া করে আমাদের আর বন্দি খাঁচার মধ্যে আটকে রাখবেন না।”
সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৈষম্য দূরীকরণ ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের দাবিতে আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
মানবেতর জীবনযাপনের অভিযোগ
সমাবেশে বক্তারা জানান, বর্তমান বাজারে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে সীমিত আয়ের তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীদের সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কবির মনির হোসেন তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, কর্মচারীরা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং কেবল টিকে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তা চান। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সাধারণ কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো উপেক্ষা করে তাদের এক প্রকার অবরুদ্ধ অবস্থায় রাখা হয়েছে।
প্রধান দাবিগুলো হলো:
বেতন স্কেল পুনর্নির্ধারণ: বর্তমান বাজারদরের সাথে সংগতি রেখে নতুন পে-কমিশন গঠন অথবা অন্তর্বর্তীকালীন মহার্ঘ ভাতা প্রদান।
বৈষম্য নিরসন: বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে বিদ্যমান বিশাল ব্যবধান কমিয়ে আনা।
আবাসন ও চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধি: যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এই খাতগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানো।
কর্মসূচির হুঁশিয়ারি
আহবায়ক কমিটির এই সদস্য হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সাধারণ কর্মচারীদের এই আর্তনাদ যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কানে না পৌঁছায়, তবে তারা আরও কঠোর কর্মসূচি পালন করতে বাধ্য হবেন। তিনি অবিলম্বে সকল প্রকার বাধা বিপত্তি সরিয়ে কর্মচারীদের ন্যায়সংগত দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান।
সমাবেশে কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন, যারা ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে নিজেদের মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরেন।
নিম্নগ্রেডের কর্মচারীরা কি আর্থিক সংকটে?
হ্যাঁ, বর্তমানে বাংলাদেশের নিম্নগ্রেডের (বিশেষ করে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের) সরকারি কর্মচারীরা গভীর আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জীবনযাত্রার ব্যয় ও নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের এই আর্থিক সংকটের পেছনের প্রধান কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি
২০২৪ ও ২০২৫ সালে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ১০-১২% এর উপরে অবস্থান করছে, যেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক ক্ষেত্রে ১৫-১৬% ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে ডাল, ভাত, তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাই এই স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কবির মনির হোসেনের বক্তব্যে “দু-মুঠো ভাত খাওয়ার জন্য আন্দোলন” কথাটি মূলত এই চরম বাস্তবতাকেই ফুটিয়ে তোলে।
২. বেতন কাঠামোর বৈষম্য ও স্থবিরতা
সর্বশেষ পে-স্কেল: ২০১৫ সালের পর দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ধরে নতুন কোনো পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়নি। যদিও বার্ষিক ৫% ইনক্রিমেন্ট এবং সম্প্রতি কিছু বিশেষ সুবিধা (১০% বিশেষ ভাতা) দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাজারের মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় তা অত্যন্ত নগণ্য।
গ্রেড বৈষম্য: উচ্চস্তরের কর্মকর্তাদের তুলনায় নিম্নস্তরের কর্মচারীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান অনেক বেশি। অনেকে অভিযোগ করেন যে, কর্মকর্তাদের গাড়ি-বাড়ির সুযোগ থাকলেও কর্মচারীরা ঠিকমতো বাসা ভাড়ার টাকাও পান না।
৩. অপর্যাপ্ত ভাতার পরিমাণ
বর্তমানে কর্মচারীরা যে হারে বাসা ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা (মাত্র ১৫০০ টাকা) বা যাতায়াত ভাতা পান, তা দিয়ে বর্তমান সময়ে জীবন চালানো অসম্ভব। শহরের বাসা ভাড়া ও যাতায়াত খরচ মেটাতেই বেতনের বড় অংশ চলে যায়।
৪. ঋণের বোঝা ও মানবেতর জীবন
আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে অনেক কর্মচারী চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কবির মনির হোসেনের “বন্দী খাঁচা” রূপকটি সম্ভবত এই ঋণের জাল এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সৃষ্ট অসহায়ত্বকে বুঝিয়েছেন।
কর্মচারীদের মূল দাবিগুলো কী কী?
এই সংকট থেকে উত্তরণে তারা সাধারণত নিচের দাবিগুলো জানিয়ে আসছেন:
অবিলম্বে ৯ম পে-কমিশন গঠন করে নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা।
ন্যূনতম বেতন ২০,০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকায় উন্নীত করা।
মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাড়ানো (২০% করার দাবি)।
সচিবালয়ের মতো সচিবালয়ের বাইরের কর্মচারীদেরও একই সুযোগ-সুবিধা প্রদান।

