সর্বশেষ প্রকাশিত

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও দশ বছরের স্থবিরতা: নতুন পে-স্কেলের দাবিতে উত্তাল সরকারি কর্মচারী মহল

দেশের সরকারি দপ্তরগুলোতে কর্মরত লক্ষ লক্ষ কর্মচারী এক চরম আর্থিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে বেতন কাঠামোতে বড় কোনো পরিবর্তন না আসা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে তাদের। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রধান উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করে সরকারি কর্মচারীদের একটি ‘খোলা চিঠি’ ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

এক দশকের হাহাকার ও বর্তমান বাজার বাস্তবতা

২০১৫ সালে সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণার পর গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির চিত্র বদলেছে আমূল। কর্মচারীদের ভাষ্যমতে, এই সময়ে চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ প্রতিটি পণ্যের দাম দুই থেকে তিন গুণ বেড়েছে। বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষা ব্যয় মেটাতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যম শ্রেণির কর্মচারীরা এখন দিশেহারা। খোলা চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমান বেতন দিয়ে মাসের অর্ধেক পার করাই যেখানে দায়, সেখানে পুরো মাস চালানো এক প্রকার ‘অসম্ভব’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও ঋণের বোঝা

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে মুদ্রাস্ফীতির হার আকাশচুম্বী। কর্মচারীরা অভিযোগ করছেন, সংসার চালাতে গিয়ে তাদের বড় একটি অংশ এখন চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে একদিকে যেমন তাদের মানসিক চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে কাজের একাগ্রতাও ব্যাহত হচ্ছে। কর্মচারীদের মতে, “রাষ্ট্রের চাকা সচল রাখি আমরা, অথচ আমাদেরই বেঁচে থাকার নূন্যতম নিরাপত্তা আজ হুমকির মুখে।”

অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপ ও প্রত্যাশা

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ‘নবম জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫’ গঠন করেছে। কমিশন গত আগস্ট থেকে কাজ শুরু করেছে এবং আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বর্তমান সরকারের মেয়াদেই নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশ ও তা কার্যকরের পরিকল্পনা রয়েছে।

কর্মচারীদের মূল দাবিগুলো হলো:

  • বাজার দরের সাথে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন।

  • সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের বৈষম্য কমিয়ে যৌক্তিক অনুপাত (সম্ভাব্য ১:৪ বা ১:৫) নির্ধারণ।

  • চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাড়ি ভাড়া ভাতার আমূল পরিবর্তন।

  • স্থগিত থাকা সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল পুনরায় চালু করা।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, দীর্ঘ সময় পর পে-স্কেল সংশোধন করা না হলে প্রশাসনে স্থবিরতা আসতে পারে। তবে একইসাথে তারা মুদ্রাস্ফীতির চাপ সামলাতে একটি সুষম বেতন কাঠামোর পরামর্শ দিয়েছেন।

সরকারি কর্মচারীদের এই খোলা চিঠি ও ক্রমবর্ধমান দাবি এখন সরকারের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। লাখ লাখ কর্মচারীর চোখ এখন আসন্ন ফেব্রুয়ারিতে কমিশনের রিপোর্টের দিকে। তারা আশা করছেন, সরকার মানবিক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে দ্রুত একটি যুগোপযোগী পে-স্কেল উপহার দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *