১১ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও পে-স্কেল নিয়ে কিছু ‘অম্ল-মধুর’ বাস্তবতা
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। ২০১৫ সালের পর নিয়ম অনুযায়ী ২০২০ সালে নতুন স্কেল হওয়ার কথা থাকলেও, বৈশ্বিক মহামারি ও অর্থনৈতিক নানা সংকটে তা পিছিয়ে গেছে দীর্ঘ ১১ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বাড়লেও বেতন বাড়েনি সেই অনুপাতে।
ড. শফিকুল ইসলামের কঠোর সমালোচনা: আয়োডিন ও প্রজ্ঞার অভাব?
সাম্প্রতিক সময়ে পে-স্কেল এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নেতিবাচক মন্তব্যের ঝড় উঠেছে। এর প্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. শফিকুল ইসলাম এক বিস্ফোরক ফেসবুক পোস্টে সমালোচকদের এক হাত নিয়েছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, যারা দীর্ঘ ১১ বছর পর হতে যাওয়া এই বেতন বৃদ্ধির বিরোধিতা করছেন, তারা মূলত ‘সম্যক জ্ঞানের অভাবে অন্ধ’ এবং ‘প্রজ্ঞা নামক ভিটামিনের অভাবে ক্ষীণদৃষ্টিসম্পন্ন’। তিনি সাফ জানিয়েছেন, এই সমালোচকদের বড় অংশই ব্যক্তিজীবনে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং নীতিবিবর্জিত চিন্তা ও পরশ্রীকাতরতায় আক্রান্ত। তার মতে, এ ধরনের নেতিবাচক মানসিকতা থেকে মুক্তি পেলেই দেশের অর্থনীতি প্রকৃত অর্থে মুক্তি পাবে।
রিকশাওয়ালার সেই ‘আগাম’ পাওনা: একটি বাস্তব চিত্র
পে-স্কেলের খবর আসতেই বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির যে হিড়িক পড়ে, তার একটি চমৎকার উদাহরণ উঠে এসেছে ড. শফিকুল ইসলামের লেখায়। রিকশা থেকে নেমে ভাড়া দেওয়ার সময় রিকশাচালক বাড়তি ভাড়া দাবি করে বসেন। কারণ হিসেবে বলেন, “স্যার, নতুন পে-স্কেল পাচ্ছেন, একটু বাড়িয়ে দেন।” কর্মকর্তা যখন বললেন যে স্কেল তো এখনো হাতে পাননি, রিকশাচালকের উত্তর ছিল আরও প্রখর— “জানি স্যার, কিন্তু এখন থেকেই বলা অভ্যাস করছি, আর আপনাদেরও মনে করিয়ে দিচ্ছি।” এই ঘটনাটি একটি রূঢ় সত্য তুলে ধরে— সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লে তার সুবিধা তারা পাওয়ার আগেই বাজারের সিন্ডিকেট এবং অন্যান্য সেবা খাতের খরচ কয়েক ধাপ এগিয়ে যায়। ফলে পকেটে টাকা আসার আগেই জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে তাদের নাভিশ্বাস ওঠে।
প্রস্তাবিত নতুন পে-স্কেলে যা থাকছে (২০২৬):
জাতীয় বেতন কমিশন ইতোমধ্যে প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের সুপারিশ জমা দিয়েছে। তথ্যানুযায়ী:
সর্বনিম্ন মূল বেতন: প্রস্তাবিত ১৮,০০০ – ২০,০০০ টাকা (২০তম গ্রেড)।
সর্বোচ্চ মূল বেতন: প্রস্তাবিত ১,৬০,০০০ টাকা (১ম গ্রেড)।
বেতন বৃদ্ধির হার: গড়ে প্রায় ১০০% থেকে ১৪২% পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশেষ সুবিধা: প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা, স্বাস্থ্যবিমা এবং টিফিন ভাতা বৃদ্ধির মতো মানবিক বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
উপসংহার
দীর্ঘ ১১ বছরের বঞ্চনার পর এই নতুন পে-স্কেল সরকারি কর্মচারীদের জন্য বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার আবশ্যকতা। ড. শফিকুল ইসলামের মতো কর্মকর্তাদের ক্ষোভ মূলত সেই সাধারণ কর্মচারীদের জন্য, যারা বাজারের উর্ধ্বগতির সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন। রিকশাচালকের সেই ‘আগাম অভ্যাস’ যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে—বেতন বৃদ্ধির সুফল পেতে হলে বাজার নিয়ন্ত্রণও সমান জরুরি।
বর্তমানে পে-স্কেল নিয়ে যারা অপ্রাসঙ্গিক সমালোচনা করছেন, তাদের উদ্দেশ্যে ড. শফিকুল ইসলাম (উপসচিব) এক কঠোর কিন্তু বাস্তবসম্মত বার্তা দিয়েছেন। ৫ বছর পর অর্থাৎ ২০২০ সালে যে পে-স্কেল হওয়ার কথা ছিল, তা ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।
কারা এই সমালোচক? ড. শফিকুল ইসলামের মতে, এই সমালোচকদের বড় অংশই:
🧂 জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অভাব: তারা সম্যক জ্ঞানহীন এবং দূরদর্শিতাবর্জিত।
🎭 নীতিবিবর্জিত: ব্যক্তিজীবনে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অন্যের ভালো সহ্য করতে না পারা (পরশ্রীকাতর) মানসিকতায় আক্রান্ত।
📉 অর্থনীতির অন্তরায়: এদের থেকে মুক্তি পেলেই দেশের অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে।
একটি ছোট গল্প, বড় শিক্ষা… 🛺
ঘটনাটি একজন সরকারি কর্মকর্তা ও একজন রিকশাওয়ালার মধ্যে:
কর্মকর্তা: “নতুন পে-স্কেল তো এখনো পাইনি, কেবল প্রস্তাব হয়েছে।” রিকশাওয়ালা: “জানি স্যার! কিন্তু এখন থেকেই বলা অভ্যাস করছি, যাতে আপনাদেরও মনে থাকে আর আমাদেরও পাওনা বাড়ে।”
সারকথা: যখন পে-স্কেলের খবর আসে, তখন বাজার থেকে শুরু করে রিকশাভাড়া—সবই আগেভাগে বেড়ে যায়। কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের পকেটে সেই টাকা পৌঁছাতে বছরের পর বছর পার হয়ে যায়। এই বৈষম্য দূর হওয়া এখন সময়ের দাবি।
আমাদের দাবি স্পষ্ট:
✅ ১১ বছরের প্রতীক্ষার অবসান হোক। ✅ বাজারের সাথে সংগতিপূর্ণ বেতন কাঠামো চাই। ✅ অযৌক্তিক সমালোচনা বন্ধ করে কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা হোক।

