মাথাপিছু আয়ে ভারত-পাকিস্তানের সমান হলেও বেতনে অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ: নতুন পে-স্কেলের জোরালো দাবি
দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় সন্তোষজনক পর্যায়ে থাকলেও, সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান ও বেতন কাঠামো নিয়ে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের প্রাক্কলিত হিসেবে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশি এবং ভারতের প্রায় সমান হওয়া সত্ত্বেও সরকারি কর্মচারীদের সর্বনিম্ন বেতন কাঠামোতে বাংলাদেশ এখনো তলানিতে পড়ে আছে।
বেতন বৈষম্যের তুলনামূলক চিত্র
সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, তিনটি দেশের মাথাপিছু আয় ও সর্বনিম্ন সরকারি বেতনের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
| দেশ | মাথাপিছু আয় (মার্কিন ডলার) | সর্বনিম্ন সরকারি বেতন (বিডিটি প্রায়) |
| বাংলাদেশ | ২৭৮৪ ডলার | ৮,২৫০ টাকা |
| পাকিস্তান | ১৭০৭ ডলার | ১৬,২৩৭ টাকা |
| ভারত | ২৮০০ ডলার | ২৪,০৪৫ টাকা |
বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ১,০৭৭ ডলার কম হওয়া সত্ত্বেও সেখানে একজন সরকারি কর্মচারী বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেতন পাচ্ছেন। অন্যদিকে, ভারতের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের কাছাকাছি হলেও সেখানে সর্বনিম্ন বেতন বাংলাদেশের প্রায় তিনগুণ।
১১ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা
সাধারণত প্রতি ৫ বছর অন্তর নতুন পে-স্কেল ঘোষণার নিয়ম থাকলেও বাংলাদেশে সবশেষ ২০১৫ সালে বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০২০ সালে পরবর্তী পে-স্কেল হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ ১১ বছর পার হয়ে গেছে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে সরকারি কর্মচারীরা চরম হিমশিম খাচ্ছেন।
সমালোচকদের প্রতি ক্ষোভ
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিরোধিতা যারা করছেন, তাদের কড়া সমালোচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আন্দোলনকারীদের মতে, যারা বৈষম্যের অজুহাত তুলে এই ন্যায্য দাবির বিরোধিতা করছেন, তারা দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং সাধারণ কর্মচারীদের কষ্ট বুঝতে ব্যর্থ। তারা বলছেন, মেধা ও শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন না হলে প্রশাসনে স্থবিরতা আসার ঝুঁকি থাকে।
উপসংহার
অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও তার প্রতিফলন সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামোতে নেই। তাই দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে এবং কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে দ্রুত নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ করা এখন সময়ের দাবি।
ন্যূনতম বেতন কেন মাথাপিছু আয়ের সমান হওয়া উচিত?
আসলে মাথাপিছু আয় এবং ন্যূনতম বেতনের মধ্যে সরাসরি গাণিতিক সম্পর্ক থাকা কেন জরুরি, তা বুঝতে গেলে অর্থনীতির কিছু মৌলিক বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন। মাথাপিছু আয় একটি দেশের গড় সমৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়, আর বেতন হলো সেই সমৃদ্ধির সুষম বণ্টন।
ন্যূনতম বেতন কেন মাথাপিছু আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত, তার প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস
মাথাপিছু আয় বেশি কিন্তু ন্যূনতম বেতন অনেক কম হওয়ার অর্থ হলো—দেশের সম্পদ গুটি কয়েক মানুষের হাতে কুক্ষিগত। যখন গড় আয়ের সাথে তাল মিলিয়ে বেতন বাড়ে, তখন সাধারণ কর্মচারীরাও দেশের জিডিপিতে তাদের অবদানের সুফল পায়। এটি সমাজের ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমিয়ে আনে।
২. জীবনযাত্রার মান নিশ্চিতকরণ (Cost of Living)
মাথাপিছু আয় বাড়ার সাথে সাথে বাজারে পণ্যের চাহিদা এবং দাম বাড়ে (মুদ্রাস্ফীতি)। একজন সরকারি কর্মচারীর বেতন যদি মাথাপিছু আয়ের চেয়ে অনেক নিচে থাকে, তবে তিনি সমাজের গড় জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হন। পুষ্টিকর খাবার, শিক্ষা এবং চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে তখন তাকে হিমশিম খেতে হয়।
৩. ক্রয়ক্ষমতা ও অর্থনীতির গতিশীলতা
অর্থনীতির ভাষায়, সাধারণ মানুষের হাতে টাকা থাকলে তারা তা খরচ করে। যখন বেতন বাড়ে, তখন বাজারে পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়, যা উৎপাদন বৃদ্ধি করে এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করে। বেতন কম থাকলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে বাজারের জন্যই ক্ষতিকর।
৪. সামাজিক নিরাপত্তা ও দুর্নীতি রোধ
একজন কর্মচারীর বেতন যখন তার সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত হয় না, তখন সমাজে দুর্নীতির প্রবণতা বেড়ে যায়। মাথাপিছু আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন কাঠামো থাকলে কর্মচারীদের মধ্যে কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সহজ হয়।
৫. আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা ও মেধা ধরে রাখা
আপনি আগেই ভারত ও পাকিস্তানের উদাহরণ দিয়েছেন। প্রতিবেশী দেশগুলোতে যখন মাথাপিছু আয়ের অনুপাতে বেতন অনেক বেশি, তখন বাংলাদেশে বেতন কম হলে মেধাবীরা সরকারি চাকরিতে আগ্রহ হারাবে অথবা দেশত্যাগের চেষ্টা করবে। একে ‘ব্রেইন ড্রেন’ বলা হয়, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ।
সহজ কথায়: মাথাপিছু আয় হলো একটি বিশাল ‘কেক’, আর বেতন হলো সেই কেকের টুকরো। কেক যদি বড় হয় (মাথাপিছু আয় বাড়ে), তবে কর্মচারীদের পাওনা টুকরোটিও (বেতন) বড় হওয়া উচিত।

